নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি

45

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। গতকাল শনিবার দলের গুলশান কার্যালয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলের সঙ্গে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তফসিল মাসখানেক পেছানোর দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেবে। দু-একদিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেবে ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল।

অবশ্য, রাত ১১টায় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ‘আজ রবিবার দুপুর ১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে যাওয়া, না-যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন ড. কামাল হোসেন।’ গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষনেতা। শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাতের এ বৈঠকে ছিলেন না। তার অনুপস্থিতিতে মির্জা ফখরুল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

বৈঠকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সংবাদ সম্মেলন থেকে তফসিল পেছানোর দাবি জানিয়ে ১৩ নভেম্বর মঙ্গলবার ইসি অভিমুখে পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। জানা গেছে, ২০-দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে যারা নিবন্ধিত তাদের মধ্যে কারা জোটগতভাবে নির্বাচন করে ধানের শীষ প্রতীক চায়, আজ রবিবার দুপুরের মধ্যে তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে বলেছে বিএনপি। এ বক্তব্যের সূত্র ধরে জোটের এক নেতা জানান, এ বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, নির্বাচনে যাচ্ছে বিএনপি। সন্ধ্যা ৬টা থেকে এক ঘণ্টা এ বৈঠক হয় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে।

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সূত্র বলেছে, বিএনপি ইসি ঘোষিত তফসিল পেছাতে চায়। এ জন্য তারা আজ রবিবার ইসিতে চিঠি দেবে। আগামীকাল সোমবার ঐক্যফ্রন্টের নেতারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে চান। এ জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে সময় চাইবেন তারা।

জানা গেছে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে বৈঠকে কিছুটা দ্বিমত দেখা দেয়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বরচন্দ্র রায় নির্বাচনে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে আরেক সদস্য মওদুদ আহমদ তাদের থামিয়ে দেন। এ সময় দুই নেতাই এর প্রতিবাদ জানালে বৈঠকে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়। নেতাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, বিএনপি তফসিল পেছানোর দাবি জানালেও সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ নাও করতে পারে। নির্বাচন কমিশন তফসিল যে কদিনের জন্য পেছায়, তা-ই মেনে নেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও ঐক্যফ্রন্ট।

একটি সূত্র জানিয়েছে, জোটগতভাবে নির্বাচনে যাবে বিএনপি। জোট শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন সমন্বয় কমিটির প্রধান করতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর করতে পারেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ বিষয়গুলো নিয়ে দলের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। তবে স্থায়ী কমিটিতে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

২০ দলের বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বিজেপি, ইসলামী ঐক্যজোট ও ডেমোক্র্যাটিক লীগ ছাড়া বাকি সবাই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, তারাও নির্বাচনে যেতে চায়। তবে জোটগত নাকি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করবে, তা বিএনপিকে আজ জানাবে নিবন্ধন হারানো দলটি।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে, ২০ দলের বৈঠক হয়েছে। এরপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক হলো। দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামীকাল দুপুর ১টায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আমাদের সিদ্ধান্তের কথা আপনাদের জানাবেন, জাতিকে জানাবেন।

২০ দলের বৈঠক শেষে জোটের সমন্বয়ক এলডিপি সভাপতি অলি আহমেদ বলেন, নির্বাচনে যাব কি যাব না, এ ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। দুদিনের মধ্যে ২০-দলীয় ঐক্যজোট আমাদের মূল দল বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে কথা বলে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।

অলি আহমেদ আরও বলেন, জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি হলো আমাদের প্রধান বিষয়, তাকে মুক্তি দিতে হবে। তা হলেই নির্বাচনের পরিবেশ ফিরে আসবে। ২০ দলের অনেক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে। যদিও সরকার বলছে, সবার জন্য নির্বাচনের সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মনে করি এটা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, পত্রিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এখনো সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।

দুদিন পর আপনারা সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলছেন অথচ নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী জোটগতভাবে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত কালকের (রবিবার) মধ্যে নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কী এমন প্রশ্নে এলডিপি প্রধান বলেন, আমরা যারা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এ জোটে আছি, তারা কমিশনের কাছে চিঠি লিখব। চিঠির ভাষা এমন হবে, যদি আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি, সে ক্ষেত্রে আমাদের দলীয় প্রতীকে অনেকে নির্বাচন করবে। আবার অনেকে ২০ দলের মূল দল বিএনপির প্রতীকে নির্বাচন করবে। এক প্রশ্নে অলি আহমেদ বলেন, নির্বাচনে গেলে আমি আমার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করব।

অলি আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিএনপির নজরুল ইসলাম খান, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, জামায়াতে ইসলামীর আবদুল হালিম, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, খেলাফত মজলিশের মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক, আহমেদ আবদুল কাদের, ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা এম এ রকীব, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, এলডিপির রেদোয়ান আহমেদ, জাগপার তাসমিয়া প্রধান, এনডিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান, মুসলিম লীগের এএইচএম কামরুজ্জামান খান, পিপলস লীগের গরীবে নেওয়াজ, ন্যাপ ভাসানীর আজহারুল ইসলাম, ডিএলের সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি, সাম্যবাদী দলের সাঈদ আহমেদ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মাওলানা নুর হোসেইন কাসেমী, মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, বাংলাদেশ জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা, পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের রিটা রহমান, মাইনরিটি জনতা পার্টির সুকৃতি কুমার মণ্ডল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জোট শরিকদের আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক হয়। এতে নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হয়। ২০-দলীয় জোটের সঙ্গে বৈঠকের পর রাত ৮টায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক শুরু হয়ে ১১টায় শেষ হয়। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জেএসডির আ স ম আবদুর রব, তানিয়া রব, আবদুল মালেক রতন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকী, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, মোকাব্বির খান, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জাহিদ উর রহমান, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর আহমেদ ও গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন।

Comments are closed.